Header Ads

দুর্নীতির বিরুদ্ধে ইসলামের হুঁশিয়ারি


আবু রুফাইদাহ রফিক;

দুর্নীতি একটি সামাজিক ব্যাধি, যা একই সঙ্গে মানুষের মনোজাগতিক ও অর্থনৈতিক অধঃপতন ডেকে আনে এবং সামাজিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতা সৃষ্টি করে। মানবাধিকার হরণের প্রধান হাতিয়ারই হচ্ছে দুর্নীতি। দুর্নীতি হলো নৈতিক অধঃপতন। প্রতিটি ন্যায়বিরুদ্ধ ও ধর্মবিরুদ্ধ আচরণই হলো দুর্নীতি। অন্য কথায়, যা নীতি থেকে দূরে অবস্থান করে তাই দুর্নীতি। আরবিতে একে 'গুলুল' এবং 'রিশওয়াহ' বলা হয়। গুলুলের শাব্দিক অর্থ আত্মসাৎ করা আর 'রিশওয়াহ'র শাব্দিক অর্থ ঘুষ বা অনৈতিক লেনদেন। অর্থাৎ ঘুষ বা অনৈতিক লেনদেনের মাধ্যমে অর্থ আত্মসাৎ করাই হলো দুর্নীতি। গুলুল শব্দটি হাদিসে, বিশেষ করে রাষ্ট্রীয় সম্পদে তছরুপ করার ক্ষেত্রে ব্যবহূত হয়েছে। সে সময় রাষ্ট্রীয় আয়ের উৎস ছিল মূলত দুটি :গনিমত ও জাকাত। এ জন্য হাদিসে এ দুটি খাত থেকে সম্পদ চুরি বা আত্মসাৎ করার ক্ষেত্রে গুলুল শব্দের ব্যাপক ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়। তবে কখনও কখনও অন্যায় পথে অর্থ উপার্জনকেও গুলুল বলা হয়েছে।

বর্তমানে রাষ্ট্রীয় কাজে অনৈতিক সুযোগ-সুবিধা প্রদানের বিনিময়ে উৎকোচ গ্রহণ করার ক্ষেত্রে দুর্নীতি শব্দটির ব্যাপক ব্যবহার হয়ে থাকে। এ ছাড়াও আরও অনেকভাবে দুর্নীতি হতে পারে। যেমন- কখনও কখনও অর্থের বিনিময়ে যোগ্য ব্যক্তির স্থানে অযোগ্য ব্যক্তিকে নিয়োগদানের মাধ্যমে দুর্নীতি করা হয়। আবার কখনও দেখা যায়, যোগ্য ব্যক্তিকে তার উপযুক্ত স্থানে নিয়োগের জন্য তার থেকে ঘুষ দাবি করা হয়, যা দিতে সে মোটেও বাধ্য নয়। তাছাড়া অফিসিয়াল দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে অনেক সময় উর্ধ্বস্তন কর্তৃপক্ষ অধস্তনদের থেকে উৎকোচ গ্রহণের বিনিময়ে তাদের অনৈতিক সুবিধা দিয়ে থাকে। সরকারি কাজে বরাদ্দের চেয়ে কম মূল্যের জিনিস ক্রয় করে পূর্ণ মূল্য গ্রহণ এবং সরকারি জিনিসপত্র ক্রয়ে সঠিক মূল্য লুকিয়ে বাড়তি মূল্যের ভাউচার তৈরি কিংবা সরকারি অর্থের অপচয় করে শৌখিনতা করা- এসবই দুর্নীতির মধ্যে পড়ে। দুর্নীতির রূপ যাই হোক না কেন, সব ধরনের দুর্নীতি ইসলাম হারাম করে দিয়েছে এবং এর কঠোর শাস্তির ঘোষণাও দেওয়া হয়েছে। পবিত্র কোরআন বলছে, যে দুর্নীতি করবে, কেয়ামতের দিন দুর্নীতির মাধ্যমে প্রাপ্ত সম্পদ নিয়ে তাকে উঠতে হবে (সুরা আলে ইমরান, ১৬১)। রাসুল (সা.) বলেন, পবিত্রতা ব্যতীত সালাত গ্রহণযোগ্য নয়, ঠিক তেমনি দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত সম্পদ দ্বারা দান করলেও তা গ্রহণ করা হবে না (তিরমিজি)। অন্য হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, তিনি (সা.) ঘুষ প্রদানকারী ও গ্রহণকারী উভয়ের ওপর লানত দিয়েছেন। ভিন্ন বর্ণনায় 'তাদের ওপর আলল্গাহর লানত' কথাটিও উলেল্গখ আছে। সাওবান (রা.) থেকে ইমাম আহমাদের বর্ণনায়, ঘুষ আদান-প্রদানে মধ্যস্থতাকারীর ওপরও রাসুল লানত দিয়েছেন বলে উলিল্গখিত হয়েছে (আবু দাউদ, তিরমিজি, ইবনে মাজাহ, আহমাদ)।

রাষ্ট্রীয় দুর্নীতির বিরুদ্ধে রাসুল (সা.) অত্যন্ত কঠোর ছিলেন। সাহাবি আবু মাসউদ (রা.) বলেন, রাসুল জাকাত উত্তোলনের জন্য পাঠানোর আগে আমাকে বললেন, 'যাও, তবে এমন যেন না হয় যে, কেয়ামতের দিন তোমার আত্মসাৎ করা উট  তোমার পিঠে আরোহণ করে ডাকতে থাকবে!' আমি বললাম, তাহলে আমি যাব না। রাসুল বললেন, 'আমি তোমার ওপর চাপ প্রয়োগ  করব না' (আবু দাউদ)।

সাহাবি আবু হুমাইদ সায়েদী (রা.) থেকে বুখারী, মুসলিম, আবু দাউদ, দারেমী ও ইমাম আহমাদ (রহ.) বর্ণনা করেছেন। রাসুল (সা.) আজাদ গোত্রের ইবনে লুতবিয়া নামক এক লোককে জাকাত উত্তোলনের জন্য প্রেরণ করেন। লোকটি জাকাত উত্তোলন শেষে রাসুলের কাছে এসে বলল, এগুলো আপনাদের (জাকাতের সম্পদ) আর এগুলো আমাকে হাদিয়া হিসেবে দেওয়া হয়েছে। তার কথা শুনে রাসুল খুবই রাগান্বিত হলেন এবং মিম্বারে দাঁড়িয়ে আলল্গাহর প্রশংসা ও গুণকীর্তন করে খুতবা দিলেন। বক্তব্যে তিনি বলেন, ওই শ্রমিকের কী হলো, যাকে আমরা জাকাত উত্তোলনের জন্য পাঠাই? সে ফিরে এসে বলল, 'এগুলো আপনাদের আর এগুলো আমাকে হাদিয়া দেওয়া হয়েছে।' আমি তাকে বলি, সে যেন নিজের বাবা কিংবা মায়ের ঘরে বসে থাকে, অতঃপর দেখুক তাকে হাদিয়া দেওয়া হয় কি হয় না। সেই সত্তার কসম, যার হাতে আমার প্রাণ! যে কেউ এ (রাষ্ট্রীয় সম্পদ) থেকে কিছু হাতিয়ে নেবে, কেয়ামতের দিন সে তা নিয়ে উত্থিত হবে; তা যদি হয় উট, তবে তা নিজ আওয়াজে ডাকতে থাকবে; তা যদি হয় গরু, তবে তা হাম্বা হাম্বা রবে ডাকতে থাকবে; আর যদি তা হয় বকরি, তবে তা ভ্যা ভ্যা করতে থাকবে! বক্তব্য শেষে তিনি হাত দুটি উপরে তুললেন; এতে তার বগলের শুভ্রতা পরিলক্ষিত হলো। তিনি বললেন, হে আলল্গাহ, আমি কি পৌঁছে দিয়েছি? এ কথা তিনি তিনবার বলেন। এ হাদিস থেকে বোঝা গেল, রাষ্ট্রীয় কাজে দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি নিজ দায়িত্ব পালনের সময় জনসাধারণের কাছ থেকে হাদিয়া বা উপহারের নামেও কিছু গ্রহণ করতে পারবে না, যদিও অন্য ক্ষেত্রে হাদিয়া দেওয়া-নেওয়া সুন্নত। আমরা দেখতে পাচ্ছি, রাসুল (সা.) লোকটির কথার সত্য-মিথ্যা যাচাইয়ের প্রয়োজন মনে করেননি, বরং এ কাজে যেন হাদিয়া গ্রহণকেই তিনি অপরাধ গণ্য করেছেন। মূলত রাষ্ট্রীয় কাজের সময় হাদিয়া বা উপহার গ্রহণের প্রবণতা থেকেই দুর্নীতি বিস্তার লাভ করে। তাই রাসুল (সা.) এই প্রবণতাকেই রোধ করতে চেয়েছেন। এ জন্য তখন কেউ দুর্নীতির চিন্তাও করতে পারেনি। যেসব সরকারি কর্মকর্তা মানুষের কাছ থেকে উপহার-উপঢৌকন গ্রহণ করছেন, তাদের উচিত উপরের হাদিস থেকে শিক্ষা নেওয়া।

সাম্প্রতিক সময়ে আমাদের দেশে রাষ্ট্রীয় কাজে দুর্নীতি দেখছি। এর কারণ হচ্ছে, মানুষের মন থেকে পরকালীন জবাবদিহির ভয় উঠে গেছে। মানুষ ভাবে, পৃথিবীতে সরকারের চোখ ফাঁকি দিয়ে রাষ্ট্রীয় সম্পত্তি আত্মসাৎ করতে পারলেই সে বেঁচে গেল, এ জন্য তাকে আর কোথাও জবাবদিহি করতে হবে না। অন্যথা তারা এমন সীমাহীন দুর্নীতি কীভাবে করতে পারে? অথচ কেয়ামত আসবে, পরকালের হিসাবনিকাশও হবে। সেদিন দুর্নীতিবাজদের কঠোর পরিণতি ভোগ করতে হবে। রাসুল (সা.) একটি সুই বা তার চেয়ে কম পরিমাণ রাষ্ট্রীয় সম্পত্তি তছরুপ করলেও তা নিয়ে কেয়ামতের ময়দানে উঠতে হবে মর্মে হুঁশিয়ারি করে গেছেন (মুসলিম)। তিনি বলেন, একটি সুই, সুতা বা তার চেয়ে কম হলেও সমর্পণ করে দেও। কারণ দুর্নীতি কেয়ামতের দিন দুর্নীতিবাজের ওপর অপমান, আগুন ও লজ্জা হিসেবে আপতিত হবে (মুয়াত্তা, দারেমী, আহমাদ)।

বর্তমানে দুর্নীতির বিরুদ্ধে যে অভিযান চলছে, তার পাশাপাশি পবিত্র কোরআন ও হাদিসে উলিল্গখিত দুর্নীতির ভয়াবহ পরিণতির প্রতি সরকারি আমলাদের মনোযোগ আকৃষ্ট করা একান্ত প্রয়োজন। কারণ শুধু প্রশাসনের ভয়ে মানুষ দুর্নীতি ছাড়বে না। এর জন্য এমন এক সত্তার ভয় অন্তরে লালন করতে হবে, যার চোখকে ফাঁকি দেওয়া অসম্ভব।

প্রভাষক, জয়নারায়ণপুর ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসা, বেগমগঞ্জ, নোয়াখালী

কোন মন্তব্য নেই

Blogger দ্বারা পরিচালিত.