Header Ads

সাইফ সিরাজের ছোটগল্প: ঈমান


অটোগ্রাফ দিচ্ছেন লেখক সাইফ সিরাজ 


এক.
দেশের সবচেয়ে বড় গ্রুপ অব কোম্পানী টিকেজি মানে তারেক খান গ্রুপ। বিজনেস জায়ান্ট বলা হয় এই গ্রুপকে। আন্তর্জাতিক টেন্ডার পর্যন্ত বিট করে এই গ্রুপ। এই গ্রুপের কনস্ট্রাকশন সেক্টরটা বিশ্বব্যাপী পরিচিত। বর্তমানে তরুণ চাকরি প্রার্থীদের সবচেয়ে পছন্দের ঠিকানা টিকেজি। তাদের প্রতিটা নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে চাকরিপ্রার্থীদের ঢল নামে রীতিমত। তারাও নানা প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে একজন এমপ্লয়ি নিয়োগ দেয়।

এই বছর থেকে এইচআর একটা নতুন আইডিয়া নিয়ে কাজ করছে। প্রত্যেক আবেদনকারীর জন্য শুরুতেই একটা ফিটনেস সেশন রেখেছে। ফিটনেস টেস্টে উত্তীর্ণ হলেই লিখিত পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগ পাবে একজন আবেদনকারী।

এই নিয়মটা নিয়ে কোম্পানির চেয়ারম্যানের একটু টেনশন আছে। তিনি ভাবছেন ফিটনেসের কারণে যদি কোন মেধাবী বাদ পরে যায়! তাঁকে এইচআর ডিপার্টমেন্ট আশ্বস্ত করেছে, মেধাবীদেরকেই ফিটনেস টেস্টে ডাকা হয়েছে। এখন যদি একজন মেধাবী মানুষ ওয়েল ফিটনেসধারী হয়, তাহলে তার ওয়ার্কিং এবিলিটি হবে অনেক স্ট্রং। অস্বস্তি সত্বেও পরীক্ষমূলকভাবে এই নিয়োগে প্রক্রিয়াটির অনুমতি দিয়েছেন চেয়ারম্যান।

এই নিয়মে প্রথম নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু হবে আজকে। দশজন একাউন্ট এক্সিকিউটিভ নেওয়া হবে। ফিটনেস টেস্ট দিতে আসছে চার হাজার প্রার্থী। দুপুর গড়িয়ে বিকেল নামলো খেলার মাঠে। চার হাজার আবেদনকারীর মধ্যে মাত্র একশো জন টিকলো ফিটনেস টেস্টে। ফিটনেস ট্রেইনারদের মধ্যে একজন বললেন, "আজকালকার ছেলেদের ফিটনেস লেভেল এতো লো!"
প্রায় সবাই সমস্বরে উত্তর দিলো ভার্চুয়াল প্রজন্মের ফিটনেস আর কতো ভালো হতো! সারা রাত আছে শুধু চ্যাটিং আর মেসেজিং নিয়ে! ঘুম তো নাই বললেই চলে।" মৃদু হাসির শব্দ হলো।

এই একশো জনের মধ্যে নয় জন পাওয়া গেল দাড়ি-টুপি আর পাঞ্জাবিওলা। যাদের প্যান্ট বা পাজামা টাখনুর উপরে। লিখিত পরীক্ষার ডেট জানিয়ে আজকের কার্যক্রম শেষ হলো। কিন্তু এই নয়জনের সবার হাতেই নিয়োগ কমিটি একটা করে চিরকুট ধরিয়ে দিল। চিরকুটে লেখা, 'ইউ হ্যাভ টু বি স্মার্ট।'

আমাদের আজকের গল্প এই নয়জনের দুইজনকে নিয়ে। চিরকুট পাওয়ার পর একেকজন একেক অর্থ নিল এই বাক্যটির। লিখিত পরীক্ষায় আসার আগে নয় জনের দুইজন ক্লীন শেভড হয়ে স্যুট টাই পরে আসলো। তিনজন পাঞ্জাবি বদলে শার্ট পরে আসলো। বাকি চার জনের দুইজন আর আসলোই না। তারা ভাবলো, "আমাদের মতোন হুজুর লুকের লোককে ওরা নিয়োগ দিবে না। আর নিজের বিশ্বাসের সঙ্গে কম্প্রোমাইজ করতেও পারবো না। সো, অন্যত্র ট্রাই করি।"

আর দুইজন ফয়সাল ও জাভেদ। এরা দুইজন বন্ধু। অনার্স ফাইনাল পড়ার সময় তাবলীগে সময় দিয়ে দাড়ি রেখেছে। মাস্টার্স পরীক্ষার পর নিজেদের পোষাকও বদলে নিয়েছে। ফয়সাল ও জাভেদ যখন তাদের বন্ধু ও পরিবারের লোকজনকে দেখালো; তখন একেকজন একেক কথা বলতে শুরু করলো। বন্ধুরা বললো, "এই হুজুর হুজুর লুক নিয়ে গেছো কর্পোরেট কোম্পানির জব করতা! ভাইরে পেট আগে। পরে বাকিসব। চাকরির আগে এইসব লুক বদলাও!"

বড় ভাইয়েরা বললো, "সময়টা এখন অন্যরকম। একটু কম্প্রোমাইজ করতেই হবে।"

পরিবারের লোকজন বললো, " আপাতত সেক্রিফাইস করো। এরপর জব হয়ে গেলে ধীরে ধীরে আবার শুরু করবা নে।"

ফয়সালের মা বললেন, "আল্লাহ্ রিজিক রাখলে এমনিতেই অইবো। নবীর সুন্নতে হাত দেওনের দরকার নাই।"

জাভেদের মা বললেন, রিজিকের মালিক আল্লাহ! বাদ দে এইরকম চাকরির চিন্তা!"

মায়ের কথা শুনে দুই বন্ধুর মনে একটু ভরসা এলো। এরপরও লিখিত পরীক্ষায় যাবে কি যাবে না এই নিয়ে বেশ দোদুল্যমান একটা অবস্থা পার করে সিদ্ধান্ত নিলো যাই হোক লিখিত পরীক্ষায় যাবে।

দুই.
লিখিত পরীক্ষা শুরু হলো সকাল ন'টায়। এগারোটায় শেষ হলো। বিকাল তিনটায় রেজাল্ট হবে। সবাই অপেক্ষা করছে। নতুন ক্লিন শেভড দুইজন একটু লুকিয়ে থাকছে। কেমন যেন লজ্জা লজ্জা লাগছে। শার্ট পরা তিনজনকেও কেমন অপ্রস্তুত দেখা যাচ্ছে। ফয়সাল আর জাভেদ নির্বিকার বসে আছে। জোহরের আযান হলে পরীক্ষার্থীর অনেকেই নামায আদায় করতে কোম্পানির মসজিদে গেল।

নামাযের পর চিরকুট পাওয়া সাতজন বারান্দায় একত্রিত হলো। তাদের মধ্যে আলাপ জমে উঠল। কেউ বলছে, "চাকরিটা জরুরি দরকার। তাই একটু ছাড় দিলাম। দেখি কি হয়!"

কেউ বলছে, "শার্ট পড়া তো আর হারাম না। তাই একটু কম্প্রোমাইজ করেছি। যদি চাকরিটা হয়ে যায়!"

ফয়সাল বললো, "আসলে এতসব ভাবিনি। স্মার্ট বলতে আরো জানা, আরেকটু ফ্রেশ লুক। ড্রেসগুলো আরেকটু পরিচ্ছন্ন, এইসবই ভেবেছি। দেখি কী হয়!"

জাভেদ বললো, "আসলে, চাকরির যোগ্যতায় একজনের আউটলুক কোন ফ্যাক্টর হতে পারে না। দেখি ভাইভা পর্যন্ত যেতে পারলে চাকরি হোক না হোক; নিজের অবস্থান নিয়ে একটা লেকচার ঝাড়বো নিশ্চিত।"

জাভেদের কথায় সবাই হেসে উঠলো। ইতোমধ্যে দুপুরের লাঞ্চের জন্য ডাক আসলো। দেখা গেলো একশো জনের মধ্যে নব্বুই জন লিখিত পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেছে। অবশ্য লাঞ্চে এসেছে দূরের পরীক্ষার্থীরা। কাছের অনেকেই বাসায় অথবা মেসে চলে গেছে।

তিন.
বিকেল তিনটায় ফলাফল প্রকাশ হলো। দেখা গেলো ত্রিশজন টিকলো। চিরকুট পাওয়া সাত জনের পাঁচজন টিকেছে। জাভেদ, ফয়সালসহ শার্ট পরুয়া দুইজন। আর ক্লীনশেভড একজন।

বিদায়ের আগে নির্বাচিত ত্রিশ জনের হাতেই আবার চিরকুট দেওয়া হলো। জানানো হলো, আগামীকাল কম্পিউটার স্কিলের পরীক্ষা হবে।

আসরের নামায আদায় করে এই পাঁচজন মসজিদের বারান্দায় বসে নিজেদের চিরকুট পড়তে বসল। দেখা গেলো সবার চিরকুটে একই লেখা। "ইউ হ্যাভ টু বি মোর স্মার্ট।" এই লেখা দেখে জাভেদের রাগ উঠে গেল। ফয়সাল বললো, "বন্ধু থামো! আমরা মূলত পরীক্ষায় পতিত হয়েছি। আল্লাহও পরীক্ষা নিচ্ছেন। কোম্পানিওলারাও পরীক্ষা নিচ্ছে।" এই কথায় সবার মুখেই মুচকি হাসি দেখা গেল।

সবাই নিজ নিজ ঠিকানায় ফিরতে লাগলো। ফয়সাল আর জাভেদ নিয়ত করলো এবারের চিরকুটের কথা কাউকে বলবে না। ইশার নামাযের পর সালাতুল হাযত আদায় করে আল্লাহর কাছেই বলবে।

দুই বন্ধু ইশার নামাযের পর আল্লাহর কাছে খুব গভীর আবেগে কান্না করলো। মিনতি করলো। বললো, "মাবুদ, এইসব চাকরি-বাকরি আর রিজিক তুমিই দাও। তুমি চাইলে চাকরি ছাড়াও রিজিকের ফায়সালা করতে পারো। আর তুমি চাইলে কেউ এই চাকরি থেকে আমাদের ফেরাতে পারবে না। আমরা তোমার রহমতের মুহতাজ।"

দুয়া শেষ করে একটা প্রশান্ত মন নিয়ে দ্রুত ঘুমাতে চলে গেল দুই বন্ধু।

চার.
পরদিন সকাল নয়টায় টিকেজির কর্পোরেট অফিসে কম্পিউটার স্কিল টেস্ট। লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ ত্রিশ জন প্রার্থী যথাসময়ে এসে হাজির হয়েছে। ওয়েটিং রুমে বসে আছে সবাই। ফয়সাল আর জাভেদ দেখলো তারা দুইজন বাদে কেউ আর দাড়িওলা নেই। সবাই স্যুটেড-বুটেড আদর্শ কর্পোরেট অফিসারের মতো বসে আছে।

অল্প সময়ের জন্য দুই জনের মন খারাপ হলো। জাভেদ বললো, "চল ফয়সাল যাইগা। আমগোর হবে না! হুদাই টাইম ওয়েস্ট না করে; চল বিসিএসের মডেল টেস্টগুলো কমপ্লিট করি গে!"

ফয়সাল বললো, "আল্লাহ্ বলেছেন, 'লা তাকনাতু মির রাহমাতিল্লাহ' আল্লাহর রহমত হতে নিরাশ হইও না।"

জাভেদ বললো, "আচ্ছা! টিকাছে। মাবুদের যা মর্জি।" অনেকটা ভাবলেশহীনভাবে।

এরপর তিনজন তিনজন করে গ্রুপ করে আলাদা আলাদা রুমে নিয়ে যাওয়া হলো সবাইকে। কাকতালীয়ভাবে জাভেদ আর ফয়সাল এক গ্রুপে রইল।

যিনি কম্পিউটার স্কিলের পরীক্ষা নিবেন তিনি এক্সেল, ডাটাবেজ, স্পেডশীট ইত্যাদি ইত্যাদি নিয়ে থিওরেটিকাল প্রশ্ন করছেন। জাভেদ আর ফয়সালের প্রতিটা উত্তরেই দারুণ, ওয়াও ইত্যাদি শব্দ বলছেন। হাতেকলমে যখন কাজ শুরু হলো; তখন পরীক্ষক অবাক হয়ে গেল। তিনি বললেন, "আপনারা এইসব সহজ পদ্ধতি কোথায় শিখলেন?"

দু'জনেই বললো, "এই তো কাজ করতে করতে। আর কম্পিউটার নিয়ে গুতাগুতি করতে করতে।" এই কথা শুনে সবাই হেসে উঠল।

টেস্ট চলতে চলতেই এইচআরের দুইজন রাশভারি টাইপ অফিসার ফয়সালদের রুমে প্রবেশ করলেন। পরীক্ষকের কথা শুনে তৃতীয়জনকে বাইরে যেতে বলে ফয়সাল ও জাভেদের সঙ্গে কথা বলতে শুরু করলেন।

অফিসার দু'জন একদমে বললেন, "দেখুন ফিটনেস টেস্ট থেকেই আপনাদের দুজনকে দেখছি। আমাদের মনে হয়েছে আপনারা দু'জনই সামথিং ডিফরেন্ট মেরিটোরিয়াস। লিখিত ও কম্পিউটার টেস্টে সেইটে প্রমাণিত হলো। এখন দেখুন, আমাদের অফিসটা একটা কর্পোরেট অফিস। এখানের কিছু কোড অব কন্ডাক্ট আছে। আমাদের এইচআরের বস আবার আপনাদের এই লোক পছন্দ করেন না। তিনিই বারবার আপনাদের মেধা দেখে চিরকুট দিচ্ছেন। আজকে আমাদের দুজনকে সরাসরিই পাঠালেন। এখন যদি কম্প্রোমাইজ না করতে পারেন তাহলে কালকের ভাইভাতে আইসেন না। শুধু শুধু বিব্রত হবেন।"

দুই অফিসারের কথা শুনে ফয়সাল বললো, 'অসম্ভব'।

জাভেদ বললো, 'আমি এভাবেই আসবো। বিব্রত হতেই আসবো। দেখি আপনাদের বস আমাকে কতটা বিব্রত করতে পারেন।'

আপনাদের জন্য শুভকামনা থাকল। বলে দুই অফিসার প্রস্থান করলেন।

দুপুর আড়াইটায় কম্পিউটার স্কিল টেস্টের রেজাল্ট দিলো। ফয়সাল ও জাভেদ সর্বোচ্চ নম্বর পেলো। অন্য পরীক্ষার্থীরা আড় চোখে দেখলো দুইজনকে। কেউ বললো, "কী লাভ এত নম্বর দিয়ে। এই কোম্পানী দাঁড়িওলা লোকদের চাকরি দিবে না।" কেউ বললো, "পুলা দুইটা ঘাউরা আছে রে!" কেউ আবার আফসোস করে বললো, " কী জমানা আইলো, সর্বোচ্চ স্কিল দেখায়াও চাকরি হবে না! দাড়ি পাঞ্জাবির কারণে! দাড়ি কি ওদেরকে মারবো!"

এইসব আলাপ জমতে জমতেই সবাই ঘরে ফেরার জন্য উঠে গেল। কারো টিউশনি আছে। কেউ জ্যামের ভয়ে। কেউ আবার এমনিতেই দ্রুত ঘরে ফিরতে চায়।

ফয়সাল আর জাভেদ বসে আছে। কোন তাড়া নেই। কোন আশা নেই। কোন রিয়েকশন নেই। এমন সময় অফিসের একজন পিয়ন এসে চা দিয়ে গেল। একটা কর্পোরেট অফিসের এই ভদ্রতা দুইজনকেই স্পর্শ করলো। চা শেষ করে দু'জন হাঁটতে লাগলো। হাঁটতে হাঁটতে একটা খেলার মাঠে প্রবেশ করলো দুই বন্ধু।

ফুটবলের কোচিং দেখতে লাগলো। দেখতে দেখতে হঠাৎ তাদের কানে একজন মধ্য বয়সীর চিৎকার ভেসে এলো। কান সচকিত করে শুনলো একজন কোচ একজন কিশোরকে ধমকাচ্ছেন। ঘটনা, কোচ কিশোরটিকে চার মাস ধরে না করছেন। তাকে দিয়ে ফুটবল হবে না। তবুও কিশোরটি প্রতিদিন প্র্যাকটিসে আসে। এই জন্য কোচ তাকে ধমকাচ্ছেন। এরপর ফয়সাল ও জাভেদ কিশোরটির হয়ে কোচকে রিকোয়েস্ট করে। কোচের মন নরোম হয়।

দুই বন্ধু এবার সিদ্ধান্ত নেয়। আগামী কালের ভাইভাতে যাবে। পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করবে। যা হওয়ার হবে।

পাঁচ.
পরদিন সকাল দশটায় দুই বন্ধু হাজির হয় ভাইভার কক্ষে। একে একে সবার ভাইভা শেষ হয়ে গেল। সব শেষে দুইজনকেই এক সঙ্গে ডাকলো ভেতরে।

প্রথমেই তাদেরকে প্রশ্নের জাল ফেলে ধরলো। একের পর এক প্রশ্ন ছুটে আসতে থাকলো দু'জনের দিকে। একটার উত্তর শেষ না হতেই আরেকটা ধেয়ে আসছে। ফয়সাল খুব ঠাণ্ডা মাথায় হ্যান্ডল করছে। জাভেদ মাঝে মাঝে ক্রেজি হয়ে উঠছে। তবে মেজাজ হারাচ্ছে না।

প্রায় এক ঘন্টা ধরে চললো দুই জনের ভাইভা। এক পর্যায়ে এইচআর প্রধান বললো, "আপনারা দু'জন বন্ধু জানতে পারলাম। বাট আপনাদেরকে যখন গতকাল বলা হলো এই লুক চেঞ্জ না করতে পারলে আসার দরকার নাই তবুও কেন আসলেন?"
- স্যার, চাকরির দরকার। আবার ঈমানের দৃঢ়তারও দরকার। যাঁর ভালোবাসা ও যাঁর ভয়ে এই লুক গ্রহণ করেছি। তাঁর ভরসাতেই না করার পরেও এসেছি। বললো ফয়সাল।

- আসলে, কে চাকরি পাবে আর কে পাবে না এইটার ফায়সালা করেন আল্লাহ। আমি আল্লাহর রহমের উপর পূর্ণ আস্থা রাখি। সে জন্যই এসেছি। বললো জাভেদ।

পুরো বোর্ডে পিনপতন নিরবতা। কেউ কথা বলছে না। অবাক হয়ে এই দুই তরুণকে দেখছে সবাই।

এমন সময় একজন নিরবতা ভেঙ্গে বললো, "আমি আপনাদেরকে কিছু প্রশ্ন করতে চাই। আপনারা একটু ভেবেচিন্তে জবাব দেবেন আশা করি।"

দু'জনেই বললো, "জ্বী অবশ্যই।"

তিনি বললেন, "আচ্ছা মিশরে এবং আরবে বহু আলেমকে দেখেছি দাড়ি নেই। শার্ট পরেন। তাহলে আপনারা জেনারেল শিক্ষিত হয়ে কেন এমন কট্টর আচরণ করছেন?

ফয়সাল বললো, "এইটা তাদের রুচির ব্যাপার। এ ছাড়া এটা তাদের কালচার। আমাদের দেশের দ্বীনদার মানুষের চেহারা কল্পনা করলে যে লুকটা চোখে ভেসে ওঠে আমরা সেইটাই গ্রহণ করেছি। দাড়ি ছাড়া একজন ধার্মিক আমি কল্পনা করতে পারি না। ফলে এইরকম ক্ষেত্রে কোন সেক্রিফাইস করবো না।"

জাভেদ বললো, "আমি আমার বাবা, মসজিদের ইমাম, তাবলীগের আমির, মাদরাসার উস্তাজ এবং দেশের নিরেট ধার্মিক মানুষদের যেমন দেখেছি তেমনটাই গ্রহণ করেছি। আমি একজন স্বতন্ত্র মানুষ আমার একটা পার্সোনালিটি আছে। সেই পার্সোনালিটিটা সুন্নাহের অনুকুল। ফলে এইটা ছাড়বো না। বাকিটা আল্লাহর হাতে।"

আরেকজন প্রশ্ন করলেন, "ইসলামের কি আসলে সুনির্দিষ্ট কোন ড্রেস কোড আছে?"

ফয়সাল বললো, " দেখুন এই দেশে আমি যার কাছে ইসলাম শিখবো, আমল শিখবো, কুরআন শিখবো, সুন্নাহ শিখবো তাদেল সকলের পোশাক কী? নবীওলা কাজ যাঁরা করছেন তাদের পোশাক কী? নবীজিকে যাঁরা ভালোবাসেন। যাঁদের জীবনের প্রতিটি কাজ নবীজীর বলে দেওয়া তরিকায় হচ্ছে, তাদের পোশাক কী? যাঁরা দিনের পর দিন মানুষকে ইসলাহ করছেন তাঁদের পোষাক কী? সব ক্ষেত্রেই দেখবেন তাঁরা পাঞ্জাবি টুপি পরছেন। এখন আমি রাসূলকে ভালোবাসি। আল্লাহকে ভালোবাসি। আর রাসূলের প্রিয়দের। আল্লাহর প্রিয় বান্দাদের পোষাক গ্রহণ করবো না তো কার পোশাক গ্রহণ করবো?

জাভেদ বললো, " রাসূলের উত্তরাধিকার হলেন আলেমগণ। তাঁরা যা বলবেন সেইটেই আমার পালনীয়। ফলে আমি আলিমদের অনুসরণ করি। তাদের মাধ্যমে রাসূলের পথ জানি। আল্লাহকে পাওয়ার পথ জানি। সো নো কমপ্রোমাইজ। আমি আমার আদর্শে কোন কম্প্রোমাইজ করবো না।

আর ইসলামের ড্রেসকোড মূলত সংখ্যাগরিষ্ঠ আমলদার মুসলিমের ড্রেসকোডই।"

এই কথোপকথন শেষে দুজনকেই বাইরে অপেক্ষা করতে বলেন অফিসারগণ।

একটু পরে দশজন সিলেক্টেড প্রার্থীর তালিকা প্রকাশিত হয়। ফয়সাল ও জাভেদের নাম এই তালিকায় নেই। দু'জনেই বলে, আল্লাহর ফায়সালা অবশ্যই কল্যাণের জন্য। এই বলে তারা প্রস্থান করে।

ছয়.
মেইন গেইটে আসতেই ফয়সাল ও জাভেদের হাতে দুইটা খাম দেওয়া হয়। খাম দু'টি গেইটে দাঁড়িয়ে খুলে দু'জনেই। দেখা যায় একটা ঠিকানা লেখা। নিচে লেখা সামনে যে লাল গাড়িটা আছে সেটি আপনাদের জন্য অপেক্ষা করছে।

একটু চোখ চাওয়া-চাওয়ি করে দুই বন্ধু। গাড়ির ড্রাইভার বলে, "চেয়ারম্যান স্যার আপনাদের পুরো আলাপ ভিডিও কনফারেন্সে শুনেছেন। স্যার আপনাদের ডেকেছেন।"

আধঘণ্টা পর তারেক খানের চেম্বারে প্রবেশ করে ফয়সাল আর জাভেদ।

প্রথমেই তারেক খান হা হা রবে হেসে উঠেন। দুইজনকেই বুকে টেনে নেন। বলেন, "ফিটনেস টেস্টের দিন থেকেই আপনাদের দশজনকে ফলো করছিলাম। আপনাদের ঈমানের জোরটা মাপতে চাইলাম। আলহামদু লিল্লাহ। আপনারা দুইজন আমাকে আপ্লুত করেছেন। দেখুন, একটা সামান্য চাকরির জন্য যদি আপনি নিজের আদর্শ ছেড়ে দেন। তাহলে আরোও বড় কিছুর জন্য আমার কোম্পানির সঙ্গে বেঈমানি করবেন না এর নিশ্চয়তা কোথায়?"

দুই বন্ধু তারেক খানকে ধন্যবাদ জানায়।

তারেক খান তাদের হাতে আবার দুইটি খাম দিয়ে বলেন, "খুলে দেখুন পছন্দ হলে কাল থেকে জয়েন করুন। আল্লাহর নামে।"

ফয়সাল আর জাভেদ খাম খুলে দেখলো, তাদেরকে জিএম পদ মর্যাদায় তারেক খানের সহকারি হিসেবে নিয়োগ দিয়ে যোগদানের অনুরোধ করা হয়েছে।

দুই বন্ধু সমস্বরে বলে উঠলো, "আলহামদু লিল্লাহ।"

লেখক: কবি, সাহিত্যিক ও আলোচিত গীতিকার।

কোন মন্তব্য নেই

Blogger দ্বারা পরিচালিত.